শাহজাহান আকন্দ শুভ ও গোলাম সাত্তার রনি Source: Dainik Amader ShomoyDECEMBER 17, 2012
…নবাবদের মহামূল্যবান হীরকখণ্ড নিয়ে গবেষক ইতিহাসবিদদের উদ্বেগ…
নবাবদের মহামূল্যবান হীরকখণ্ড দরিয়া-ই-নূর সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে উধাও হয়ে গেছে বলে কোনও-কোনও সূত্র দাবি করেছে। শুধু দরিয়া-ই-নূরই নয়, সোনালী ব্যাংকের ভল্টে থাকা নবাব পরিবারের মহামূল্যবান স্বর্ণালঙ্কারও খোয়া গেছে বলে আশঙ্কা নবাবদের উত্তরসূরি ও প্রত্নসম্পদ গবেষকদের। এ অবস্থায় তারা দরিয়া-ই-নূরসহ ভল্টে থাকা নবাবদের মহামূল্যবান স্বর্ণালঙ্কারের বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
নবাব পরিবার নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সোনালী ব্যাংক থেকে যেভাবে হাজার-হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে, তেমনটি দরিয়া-ই-নূরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রত্নসম্পদ গবেষকরা বলেন, সারাবিশ্বে বড় আকৃতির দুটি হীরকখণ্ড সবচেয়ে মূল্যবান ও ঐতিহাসিক। এর একটি কোহিনুর, অন্যটি দরিয়া-ই-নূর। কোহিনুর আছে ব্রিটেনের রানির কাছে এবং দরিয়া-ই-নূর ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের ভল্টে। বাংলার ইতিহাসের বহু ঘটনার নীরব সাক্ষি এই মহামূল্যবান রত্ন। ‘দরিয়া-ই-নূর’ অর্থ ‘আলোর সাগর’। এটা বাজুবন্ধ আকৃতির। মূল হীরকটির ওজন ২৪ থেকে ২৬ ক্যারেট। পার্শ্ববর্তী প্রতিটি হীরকের ওজন ৬ থেকে ৫ দশমিক ২৫ ক্যারেট। ১১টি হীরকের সর্বমোট ওজন ৭২ থেকে ৭৬ ক্যারেট। কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূর অন্র্লপ্রদেশের কৃষ্ণা নদীর তীরে কোল্লুর খনিতে পাওয়া গিয়েছিল বলে জানা গেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে দরিয়া-ই-নূর অন্র্লপ্রদেশের মারাঠা রাজার কাছ থেকে হায়দরাবাদের নবাবদের পূর্বপুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নেন (যখন বাংলাদেশে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত)। বিভিন্ন হাত ঘুরে অবশেষে এটি পাঞ্জাবের শিখ মহারাজ রণজিত্ সিংহের হাতে পৌঁছে। তার বংশধর শের সিংহ ও নেল সিংহের হাতে এটি ছিল। ১৮৫০ সালে পাঞ্জাব দখলের পর ইংরেজরা কোহিনুরের সঙ্গে দরিয়া-ই-নূরও করায়ত্ত করে। ১৮৫০ সালে প্রদর্শনীর জন্য কোহিনুর ও দরিয়া-ই-নূর ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। হীরকখণ্ড দুটি মহারানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার হিসেবে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কিন্তু মহারানী কোহিনুর পছন্দ করলেও দরিয়া-ই-নূর করেননি। তখন হীরকখণ্ডটি বিক্রির জন্য ভারতে ফেরত আনা হয়। ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকার ১৮৫২ সালে দরিয়া-ই-নূর নিলামে তুললে ঢাকার ভাগ্যবান জমিদার খাজা আলিমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় কেনেন। কিছুদিনের মধ্যেই এর মূল্য দাঁড়ায় কয়েক লাখ টাকা। দরিয়া-ই-নূর ঢাকার নবাবরা সাধারণত আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিধানকালে বাজুবন্দ হিসেবে ব্যবহার করতেন। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এটি নবাব এস্টেটের চিফ ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে চলে যায়। এরপর বহুদিন ধরে কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির হেফাজতে ছিল। প্রতি বছর ফি বাবদ ২৫০ টাকা দিতে হত নবাবদের। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিভাগীয় কমিশনার এবং রাজস্ব বোর্ডের অনুমতিক্রমে নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নসুরুল্লাহর সঙ্গে এস্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার বেলায়েত হোসেন কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির কাছ থেকে ১৯৪৯ সালে ভেলভেট কাপড়ে মোড়ানো বাক্সে ছয়টি রত্নসহ দরিয়া-ই-নূর ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায় রাখেন।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ঢাকা ইম্পেরিয়াল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। তখন ১৯৬৬ সালে দরিয়া-ই-নূর রাখা বাক্সটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সদরঘাট শাখায় গচ্ছিত রাখা হয়। ’৭১-এ বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ব্যাংকটির নতুন নামকরণ হয় সোনালী ব্যাংক। এর রসিদ এখনও চিফ ম্যানেজার নবাব এস্টেটের কাছে গচ্ছিত থাকার কথা। নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জমিদারি আয় কমে গেলে আর্থিক দৈন্যে পড়েন নবাব সলিমুল্লাহ। হাতি, ঘোড়া, উটের বহরসহ স্থাবর-অস্থাবর অনেক সম্পত্তি তিনি বিক্রি করে দেন। তাতেও না কুলালে তিনি ঋণ নেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ যখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঋণ নেন, তখন দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। ১৯৭৪ সালে জাতীয় জাদুঘর হীরকটি তাদের হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে প্রায় ৬০ বছর পর এর মূল্য নির্ধারণ করে ৫ লাখ টাকা। কিন্তু জাদুঘর সেটি সংগ্রহ করতে পারেনি। এখনও ব্যাংকের ভল্টেই আছে কিনা, তা কেউ বলতে পারেননি।
সূত্র জানায়, সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে দরিয়া-ই-নূরের গুণগতমান যাচাই, মূল্য নির্ধারণ এবং জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তত্কালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করেছিল সরকার। কিন্তু সে কমিটি কোনও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এর আগে ১৯৮৫ সালে নবাব পরিবারের ‘বিই’ প্রপার্টির মালিকের পক্ষ থেকে হীরকটির বিশুদ্ধতা যাচাই এবং পরিমাপ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য উটাহ জেমোলজিক্যাল সার্ভিস কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা পরীক্ষা করে হীরকটির অকৃত্রিম বিশুদ্ধতা পেয়েছিল। কিন্তু এখন মহামূল্যবান হীরকখণ্ডটি সোনালী ব্যাংকের ভল্টে আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকের মধ্যে।
আহসান মঞ্জিলের কিপার ড. মো. আলমগীর বলেন, ইংল্যান্ডে রাজপরিবার ২০ ডলারের বিনিময়ে কোহিনুর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে থাকে। দরিয়া-ই-নূর হীরকটিও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার সঙ্গে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটি জাতীয় জাদুঘর কিংবা আহসান মঞ্জিলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার সঙ্গে রাখা যেতে পারে। ড. মো. আলমগীর নবাব পরিবারের অবদানের ওপর গবেষণা করেছেন। তিনি ২০ বছর আগে দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ধরেছিলেন ৫২ কোটি টাকা। তিনি বলেন, যখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত তখন দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ওই হিসাব অনুযায়ী এখন চালের প্রতি কেজির মূল্যমান ধরলে দরিয়া-ই-নূরের বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, দুর্লভ বস্তু হওয়ার কারণে এ ধরনের সম্পদ মূল্যায়নের জন্য কোনও বিধিবিধান অথবা মানদণ্ড নেই। তত্কালীন মারওয়ারের রাজা মালদেব কোহিনুর কেনার সময় সম্রাট নাকি বলেছিলেন, এটি ক্রয়-বিক্রয় হয় না। অস্ত্রবলে জয় করা যায়।
নবাব পরিবারের জনকল্যাণমূলক সংস্থা আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নাজমুল হক বলেন, দরিয়া-ই-নূরসহ সোনালী ব্যাংকের ভল্টে নবাব পরিবারের যেসব স্বর্ণালঙ্কার আছে তার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা; ১৯০৭ সাল থেকে যা রক্ষিত আছে। দরিয়া-ই-নূরসহ নবাবদের এই মহামূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কী পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার গচ্ছিত রয়েছে তার ছবিসহ তালিকা প্রকাশ করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকার নবাবদের স্মৃতিগাঁথা আবাসস্থল আহসান মঞ্জিল যখন বস্তিতে রূপান্তর হয়ে নিলামে ওঠার দ্বারপ্রান্তে। সেই নিলাম প্রস্তাবটি ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু তখন আহসান মঞ্জিল নিলামে বিক্রির প্রস্তাব নাকচ করেন। ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর এক আদেশে বঙ্গবন্ধু লেখেন, ‘আহসান মঞ্জিল বিক্রয় করিবার প্রস্তাব দেখিলাম। নিলামের বিক্রয়ের মূল কারণ ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যবৃন্দের কাছ থেকে সরকারের পাওনা আদায় করা ও বিক্রয়লব্ধ টাকার বাকি অংশ তাদের মধ্যে বিতরণ করে তাদের অর্থকষ্ট লাঘব করা। আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক মূল্য বিচার করিয়া উহাকে সংরক্ষণ করা সমীচীন বলিয়া মনে হয়। ঢাকার মিউজিয়াম ও পর্যটন কর্পোরেশনের প্রস্তাব দুটি সমন্বিত করিয়া একটি প্রকল্প তৈরি করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে আহসান মঞ্জিল বর্তমান অবস্থায় সংরক্ষিত হইতে পারে। উহাকে ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত করা যাইতে পারে।’ বঙ্গবন্ধুর ওই সিদ্ধান্তের কারণেই আহসান মঞ্জিল নিলামের হাত থেকে রক্ষা পায়। যে ঐতিহাসিক স্থাপনা আজও কালের সাক্ষি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গার তীরে।
ইরান সরকারের মালিকানায় ১৮৫ ক্যারেট ওজনের আরেকটি দরিয়া-ই নূর হীরকখণ্ড রয়েছে। সেটি পাওয়া গিয়েছিল অন্র্লপ্রদেশের গোলকণ্ডা খনিতে। ফরাসি অলঙ্কার ব্যবসায়ী ট্যাভেরনিয়র ১৬৪২ সালে ভারত এসে যে গ্রেট ট্যাবল ডায়মন্ড দেখেছিলেন সেটাই ইরানে আছে। ঢাকার নবাব পরিবারের দরিয়া-ই-নূর দক্ষিণ ভারতের খনিতে পাওয়া গেছে বলে কোনও-কোনও ইতিহাসে উল্লেখ আছে।